বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) প্রকাশিত Future of Jobs Report 2025 আমাদের সামনে একটি বাস্তবতা তুলে ধরেছে—বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, সবুজ অর্থনীতির রূপান্তর, অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কারণে কর্মসংস্থানের খাত বড় ধরণের রূপান্তরের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, এই দশকে বিশ্বব্যাপী ১৭০ মিলিয়ন নতুন চাকরি সৃষ্টি হবে, যা বর্তমান কর্মসংস্থানের প্রায় ১৪%। তবে একই সময়ে ৯২ মিলিয়ন চাকরি হারিয়ে যাবে, ফলে নিট চাকরির প্রবৃদ্ধি হবে ৭৮ মিলিয়ন।

বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এটি একদিকে যেমন সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জও বটে।

🔍 বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক ভবিষ্যতের চাকরি

রিপোর্ট অনুসারে যে পেশাগুলোর চাহিদা বাড়বে, সেগুলোর অনেকগুলো বাংলাদেশের শ্রমবাজারেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যেমনঃ

কৃষিকর্মী (Farmworkers):
সবুজ অর্থনীতির দিকে যাত্রা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি খাতে বড় পরিবর্তন আসছে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, স্মার্ট কৃষিকাজ, অর্গানিক ফার্মিং – এসব দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের কৃষি খাত নতুনভাবে কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

ডেলিভারি ড্রাইভার ও লজিস্টিকস কর্মী:
ই-কমার্স ও অনলাইন বাণিজ্যের প্রসারে বাংলাদেশে কুরিয়ার ও লজিস্টিক খাতে বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সফটওয়্যার ডেভেলপার ও আইটি বিশেষজ্ঞ:
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আইসিটি সেক্টরে অগ্রসরমান। ভবিষ্যতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বিগ ডেটা, সাইবার সিকিউরিটি, ফিনটেক ইঞ্জিনিয়ার – এসব প্রযুক্তিভিত্তিক পেশায় বিপুল চাহিদা সৃষ্টি হবে।

নার্সিং ও কেয়ার কর্মী:
জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফলে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট, কেয়ারগিভার ইত্যাদি পেশার সম্ভাবনা বাড়ছে, বিশেষ করে বিদেশে কর্মসংস্থানের দিক থেকেও।


🧠 প্রয়োজনীয় দক্ষতা: বাংলাদেশের তরুণদের কী শেখা উচিত?

রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় স্কিলের ৩৯% পরিবর্তন হয়ে যাবে। তাই “একটি ডিগ্রি = একটি ক্যারিয়ার” ধারণা এখন আর কার্যকর নয়।

প্রযুক্তি-ভিত্তিক দক্ষতা যেগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে:

  • আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)
  • বিগ ডেটা অ্যানালাইটিক্স
  • সাইবার সিকিউরিটি
  • টেক লিটারেসি ও ক্লাউড কম্পিউটিং

মানবিক ও সফট স্কিল যেগুলো ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে:

  • সৃজনশীল চিন্তা (Creative Thinking)
  • স্থিতিস্থাপকতা, নমনীয়তা ও অভিযোজন (Resilience, Agility)
  • নেতৃত্ব ও সামাজিক প্রভাব (Leadership & Social Influence)
  • জীবনব্যাপী শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা (Lifelong Learning)
  • বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা (Analytical Thinking)

📈 বাংলাদেশে কী করা দরকার?

কারিগরি ও প্রযুক্তি-ভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ:
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র, টেক ভোকেশনাল প্রোগ্রাম ও অনলাইন স্কিল ট্রেনিং প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা উচিত।

উদ্যোক্তা তৈরি ও স্টার্টআপ সংস্কৃতি:
চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণরা যেন উদ্যোক্তা হতে পারে, সে সুযোগ তৈরি করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন স্কিল, ফান্ডিং, মেন্টরিং ও সহজ নীতিমালা।

রিস্কিলিং ও আপস্কিলিং:
বর্তমান কর্মজীবীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও আপডেটেড স্কিল ট্রেনিং জরুরি। কোম্পানিগুলোকেও কর্মীদের বিকাশে বিনিয়োগ করতে হবে।

বিশ্ববাজারের জন্য দক্ষতা:
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যকর্মী, আইটি এক্সপার্ট, টেকনিক্যাল ও কেয়ার কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশ এখানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


উপসংহার

ভবিষ্যতের চাকরি মানে শুধু প্রযুক্তি নয়, বরং প্রযুক্তির সাথে মানবিক দক্ষতার সমন্বয়।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী যদি সময়োপযোগী দক্ষতা অর্জন করে, তাহলে এই পরিবর্তিত বিশ্বে তারা শুধু চাকরির পেছনে ছুটবে না, বরং চাকরি তৈরি করবে।

👉 তাই এখনই সময়—সঠিক দক্ষতা অর্জনে বিনিয়োগ করার।